খালেদা জিয়া: আপোসহীন সংগ্রামের এক দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়

প্রকাশিত: ২:৫৬ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৯, ২০২৬

খালেদা জিয়া: আপোসহীন সংগ্রামের এক দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়

বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট, দিনাজপুর জেলায়। পিতা ইস্কান্দার মজুমদার ও মাতা তৈয়বা মজুমদারের সন্তান খালেদা জিয়া শৈশব থেকেই পারিবারিক শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধে বেড়ে ওঠেন। দিনাজপুরে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি ইডেন কলেজে অধ্যয়ন করেন। ১৯৬০ সালে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহের মাধ্যমে তাঁর জীবন নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে, যা পরবর্তী সময়ে তাঁকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। বেগম খালেদা জিয়া ৩৫ বছর বয়সে স্বামী হারায়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়া এমন এক নাম, যাঁর জীবন কেবল ক্ষমতা ও পদ-পদবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তাঁর পুরো রাজনৈতিক যাত্রা জুড়ে রয়েছে সংগ্রাম, ত্যাগ, প্রতিরোধ এবং আপোসহীন অবস্থানের এক দীর্ঘ ধারাবাহিকতা। ব্যক্তিগত শোক, পারিবারিক বিপর্যয় ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে।

খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে প্রবেশ ছিল আকস্মিক এবং বেদনাবিধুর। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তাঁর ব্যক্তিগত জীবন যেমন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তেমনি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়। একসময় গৃহিণী হিসেবে পরিচিত খালেদা জিয়া স্বামীর মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে নিজেকে আবিষ্কার করেন জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।

আশির দশকে সামরিক শাসন ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলনে খালেদা জিয়া ছিলেন অন্যতম প্রধান মুখ। রাজপথের আন্দোলন, হরতাল ও রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। নব্বইয়ের গণআন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হয়ে তিনি প্রথমবারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী হন। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ তাঁর শাসনামলের উল্লেখযোগ্য দিক। পরবর্তীতে আরও দুই দফা তিনি সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। তবে তাঁর শাসনামল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিরোধ ও বিতর্কেও আলোচিত হয়েছে।

ক্ষমতায় থাকার চেয়ে ক্ষমতার বাইরে থাকা সময়েই খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক চরিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিরোধী নেত্রী হিসেবে তিনি রাজপথের আন্দোলন, নির্বাচন ও রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। রাজনৈতিক আপসের পরিবর্তে প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের অবস্থান ধরে রাখাই ছিল তাঁর রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য।

রাজনীতির পাশাপাশি খালেদা জিয়ার পারিবারিক জীবন ছিল ত্যাগ ও বেদনায় পরিপূর্ণ। স্বামী হত্যার পর একা হাতে সন্তানদের লালন-পালন করা তাঁর জীবনের অন্যতম কঠিন অধ্যায়। বড় ছেলে তারেক রহমান রাজনৈতিক মামলার কারণে দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান করছেন। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর অকাল মৃত্যু তাঁর জীবনে গভীর শোকের ছাপ রেখে যায়। এসব ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের মাঝেও তিনি রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেননি।

রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়েছে খালেদা জিয়াকে। দীর্ঘ কারাবাস, বার্ধক্যজনিত জটিলতা ও গুরুতর অসুস্থতার মধ্যেও তাঁর রাজনৈতিক দৃঢ়তা ভেঙে পড়েনি। দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে তিনি এই সময়েও প্রতিরোধ ও অনমনীয়তার প্রতীক হয়ে থাকেন।

খালেদা জিয়াকে ঘিরে রাজনৈতিক মূল্যায়ন বরাবরই বিভক্ত। সমর্থকদের কাছে তিনি আপোসহীন গণতন্ত্রকামী নেত্রী, যিনি ব্যক্তিগত ত্যাগের বিনিময়ে রাজনৈতিক আদর্শ ধরে রেখেছেন। সমালোচকদের মতে, তাঁর শাসনামলে নানা সীমাবদ্ধতা ও বিতর্ক ছিল। তবে উভয় পক্ষই স্বীকার করেন—বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী।

শোক, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা খালেদা জিয়ার জীবন আমার দৃষ্টিতে কেবল একজন নেত্রীর গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, সংঘাত এবং গণতান্ত্রিক অভিযাত্রারই প্রতিচ্ছবি।২০২৫ সালে ৩০শে ডিসেম্বর ৮০বছর বয়সে বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের পরিসমাপ্তী ঘটে।

লেখক-খোরশেদ আলম চৌধুরী

প্রধান সম্পাদক

নয়া আলো অনলাইন পোর্টাল

নাঙ্গলকোট টাইমস

নির্বাহী সদস্য,বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল,

নাঙ্গলকোট উপজেলা শাখা,কুমিল্লা।

ফেইসবুকে আমরা

সর্বশেষ সংবাদ